May 18, 2021

রোজা ও অটোফেজির মধ্যে পার্থক্য

রোজার মাস আসলেই মুসলিমরা গর্ব করে রোজার নানা ফজিলত ব্যক্ত করে। তারা ফাস্টিং এবং অটোফেজির যে বিষয়গুলো নিয়ে আসে, তার সাথে আসলে রোজার কোন সম্পর্ক নেই। রোজা আর ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে তারা এক করে ফেলে। চারিদিকে রোজার উপকারিতা নিয়ে মহা ধুমধামে প্রচারণা চললেও এই কথাটা বুঝিয়ে বলার কেউ নেই যে রোজা আর ফাস্টিং আসলে এক নয়। ইদানীং এর সাথে যোগ হয়েছে “অটোফেজি”, যার কারণে মুমিনরা আরও বেশি রোজা নিয়ে গর্ব করছে।

ফাস্টিং আসলে ইসলামে প্রথম নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায় ফাস্টিং প্রচলিত ছিল এবং আছে। মুসলিমরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ’সিয়াম’। খ্রিস্টানরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ’ফাস্টিং’। হিন্দু বা বৌদ্ধরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় ’উপবাস’। মেডিক্যাল সাইন্সে রোজা রাখকে বলা হয় ’অটোফেজি’।

’অটোফেজি’ সংক্রান্ত গবেষণা করে বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওহশোমি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। এটি ওজন কমানো এবং শরীরের টক্সিক উপাদানগুলো বের করে দিতে সাহায্য করে। কিন্তু মুসলিমদের রোজা আলাদা বিষয়। এই লেখায় আমি প্রতিটি বিষয় কি এবং এর পার্থক্যগুলো নিয়ে আলোচনা করবো।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা অটোফেজি কি?

’অটোফেজি’ আক্ষরিক অর্থ হল নিজেকে খাওয়া। আমরা যখন না খেয়ে থাকি তখন আমাদের শরীরের কোষ গুলো বেকার হয়ে যায়। কিন্তু তারা নিষ্ক্রিয় বসে না থেকে শরীরের আবর্জনা গুলো পরিষ্কার করতে থাকে। আমরা যখন দীর্ঘ সময় খাওয়া থেকে বিরত থাকি, তখন আমাদের শরীরের কোষ গুলো বাইরে থেকে খাওয়া না পেয়ে নিজেই নিজেকে খাওয়া শুরু করে। এ সময়ে আমাদের শরীরের যেমন অতিরিক্ত মেদ কমাতে সাহায্য করে, তেমনি আমাদের শরীরের টক্সিক জিনিষ গুলো Detox and Flush Out হয়ে যায়।

আমারদের শরীরে কোষ গুলো অনেক কাজ করে ফলে তারা কোষের ময়লা আবর্জনা গুলো ভালোভাবে বের করে দিতে পারে না। আমরা যদি খাওয়া বন্ধ করে দেই তাহলে শরীরের কোষ গুলো এই আবর্জনা বের করে দিতে সময় পায় এবং এই Flush করার জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং হল খাওয়া এবং খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকার একটি চক্র, যেখানে আপনি দিনের মধ্যে একটা সময়ে খাদ্য খাবেন এবং কিছু সময় খাদ্য না খেয়ে শুধু পানি বা তরল খাবার খেয়ে থাকবেন।

ফাস্টিং কিভাবে করতে হয়?

অটোফেজির খাওয়া এবং ফাস্টিং করার সাইকেল বিভিন্ন ভাবে প্রাকটিস করা যায়। যেমন, ফাস্টিং এর সময় আপনি কোন ধরণের সলিড খাবার খেতে পারবেন না। তবে আপনি কি খাবেন সেটার উপর কোন বাধ্যবাধকতা নেই। আপনি কখন খাবেন সে বিষয়টাই জরুরী । আপনি দিনে ঘড়ি ধরে চাহিদা অনুযায়ী ১৩ থেকে ২৪ ঘণ্টা খাওয়া দাওয়া ছাড়া থাকবেন। এবং এটা করবেন সপ্তাহে দুইবার। তবে অবশ্যই আপনাকে ফাস্টিং অবস্থায় প্রচুর পরিমাণ পানি খেতে হবে।

ফাস্টিং এ কি কি খাওয়া যাবে?

অনেকেই প্রশ্ন করে যে ফাস্টিং করলে কি কি খাওয়া যাবে বা যাবেনা। ফাস্টিং অবস্থায় আপনি আপনার খুশি মতো যে কোন ধরনের লো ক্যালোরি লিকুইড খেতে পারবেন। যেমন গ্রিন টি, কফি, জুস ইত্যাদি ইত্যাদি। ডাক্তাররা বেশি বেশি পানি এবং জুস খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

রোজা কি ফাস্টিং? রোজার সাথে অটোফেজির পার্থক্য কি?

মুসলিমরা মনে করে যে রোজা আর ফাস্টিং একই জিনিষ। কিন্তু এটা তাদের ভুল ধারণা। রোজা আর ফাস্টিং এর মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন রোজা রাখা হয় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। কিন্তু ফাস্টিং করা হয় ঘড়ি ধরে ১৩-২৪ ঘণ্টা। রোজার মধ্যে পানি খাওয়া যায় না কিন্তু ফাস্টিং এ ডাক্তাররা প্রচুর পরিমাণ পানি খাওয়ার পরামর্শ দেন। রোজা টানা এক মাস রাখতে হয় কিন্তু ফাস্টিং সপ্তাহে ২-১ বারের বেশি নয়।

রোজা আসলে একটি ধর্মের রীতি। এর সাথে নামাজ, এবং সিয়াম সাধনার সবগুলো নিয়ম মেনে চলতে হয়। অর্থাৎ পানাহার থেকে বিরত থাকা ছাড়াও যে সব বিষয় ধর্মে নিষেধ আছে যেমন সকল প্রকার পাপ থেকে দূরে থাকা, স্ত্রী সহবাস না করা এবং সবার সাথে ভদ্র আচরণ করা।

রোজা:

১। আল্লাহর নামে শুরু ও শেষ হয়। এখানে মেডিকেল কোন ভালো দিক চিন্তা করে করা হয় না।
২। একমাত্র আল্লাহকে কত ভালবাসে তা প্রমাণ করার জন্য করতে হয়।
৩। কোন খাবারই গ্রহণ করা যায়না।
৪। স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে হয়।
৫। রোজা সূর্য ওঠার আগ থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। কোথাও ৬ ঘন্টা কোথাও ২৩-২৪ ঘন্টা! অবস্থান হিসেবে আলাদা, ব্যক্তি বা তার চিকিৎসার প্রয়োজনবিশেষে নয়।
৬। সারাদিন না খেয়ে সারা রাত যত খুশি যত খুশি খাওয়া যায়।
৭। টানা এক মাস করতে হয়।
৮। আল্লাহর নামে চলিলাম, মরি বাঁচি! নানা ধরণের মানসিক ও শারীরিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে কিন্তু সেগুলো সহ্য করাই আসলে পরীক্ষা!
৯। অতি প্রাচীন কাল থেকেই নানা ধর্মে বা অঞ্চলে নানাভাবে প্রচলিত এবং কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

মেডিকেল ফাস্টিং (অটোফেজি):

১। বিশেষজ্ঞের পরামর্শে শুরু ও শেষ হয়।
২। প্রধানত নানা রকম টেস্ট করতে, ওজন কমাতে, চিকিৎসার প্রয়োজনে করতে হয়। সুস্থ থাকতেও করা যেতে পারে। সাধারণত সপ্তাহে এক দিন যা সারা বছর করা যেতে পারে।
৩। পানি, নানা তরল খাবার বা ওষুধ এমনকি সামান্য খাবার গ্রহণ করা যায়।
৪। নির্দিষ্ট ব্যায়াম/কাজকর্ম করতে হয় বা এড়িয়ে চলতে হয়।
৫। ব্যাক্তি ও চাহিদা অনুযায়ী সময় নির্ধারিত হয়। সাধারণত সপ্তাহে ২-১ দিন, ১৩ ঘন্টা থেকে ২৪ ঘন্টা হতে পারে।
৬। নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট খাবার খেতে হয়।
৭। নির্ধারিত সময়ে করতে হয়।
৮। কোন সমস্যা দেখামাত্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়।
৯। এটা বিজ্ঞানসম্মত ।

যদিও রোজার কিছু উপকারিতা রয়েছে যেমন রোজা পালনে সিয়াম সাধনে বা সংযম সাধনে সাহায্য করে এবং এক মাস আপনি ডিসিপ্লিনে থাকেন, কিন্তু রোজা কিছুতেই মেডিকেল ফাস্টিং বা অটোফেজি নয়।

রোজা থাকলে কি কি ক্ষতি হতে পারে?

আমাদের দেশে আমরা যেভাবে সারা দিন না খেয়ে দিন শেষে ইচ্ছা মতো ভাজা পোড়া খাই, তা আমাদের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। এতে শরীরের টক্সিসিটি আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। রোজা রাখার পর হালকা খাবার খাওয়া উচিৎ এবং ভাজা পোড়া, তেল যুক্ত খাবার পরিহার করা উচিৎ এবং যতদূর সম্ভব তরল জাতীয় খাবার, ফল মূল এবং সাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া উচিৎ।

মুমিনরা মুলত অটোফেজি বা মেডিকেল ফাস্টিং এর উপকারিতাগুলোই রোজার উপকারিতা বলে চালিয়ে দেন। এটা একটি অপপ্রচার ছাড়া কিছুই নয়। একটানা বারো-পনেরো ঘন্টা পানি না খেয়ে থাকার শারীরিক ক্ষতি এবং মানসিক ক্ষতিও হতে পারে । এ থেকে শরীরে মারাত্মক ডি-হাইড্রেশন হয়। যাদের ব্লাড প্রেশার, ডায়বেটিস, রক্ত শুন্যতা, হাইপার টেনশন, ইত্যাদি রোগ আছে অথবা গ্যাস্ট্রিক আলসার রোগ আছে, তাদের জন্য রোজা ক্ষতিকর হতে পারে।

প্রথম আলোতে একজন কার্ডিলজিস্ট (ডাক্তার) ডাঃ রেয়ান আনিস বলেছেন রোজা থাকলে ব্লাড প্রেসার কমে, রক্তে সুগার কমে, হার্টের ডিজিস কমে! তার কাছে আমার প্রশ্ন বাংলাদেশে প্রচুর ব্লাড প্রেসার এবং হার্টের রোগী আছে।
উনি এবং বাংলাদেশের কোন ডাক্তার ট্রিটমেন্ট হিসাবে কোন রোগীকে (ব্লাড প্রেসার এবং হার্টের রোগী) রোজা থাকার পরামর্শ দিয়েছেন জীবনে? একজন ডাক্তার যখন এভাবে কথা বলেন তখন তার পেশা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা খুবই বাঞ্চনীয়। রোজা বা উপবাসের কিছু কিছু উপকারিতা আছে। তবে সে রোজা ইসলামী বিধানের রোজা নয়। সেই রোজার মধ্যে অল্প খাওয়া বাধ্যতামূলক।

রোজা ও অটোফেজির মূল পার্থক্য হলো রোজার সময় কিছুই খাওয়া যায় না। অন্যদিকে অটোফেজির সময় অল্প কিছু খাবার এবং জল বা জুস খাওয়া বাধ্যতামূলক। আসলে ধর্মের কারণে মানুষগুলি এভাবে মিথ্যা বলে অপপ্রচার চালায় আর কিছু মডারেট মুসলিমরা এটা নিয়েই লাফালাফি শুরু করে দেয়, সত্যতা যাচাই না করেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *